আইএমএফের সাথে পিএসআই চুক্তি
পূনঃবিবেচনার আবেদন
প্রয়োজন আইএমএফের বিশ্বব্যাপী গণবিরোধী
ভূমিকার পর্যালোচনা
১। ঢাকায় আইএমএফের বর্তমান মিশন ও পিএসআই
গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় আইএমএফের বিরাট এক প্রতিনিধি দল কাজ করছে, তারা ঢাকায় ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকবেন। শোনা যাচ্ছে, তারা এর মধ্যে সরকারের সাথে পিএসআই (পলিসি সাপোর্ট ইনস্ট্রুমেন্ট বা নীতি সহায়তা হাতিয়ার) চুক্তি সমঝোতা চূড়ান্ত করবেন। আইএমএফের মতে যেসব দেশ সরাসরি আর্থিক সহায়তা নেবে না তাদের জন্য এই পিএসআই। পিএসআই-এর মাধ্যমে তারা সরকারকে মুদ্রা রিজার্ভ, আয় বিনিময়, বৈদেশিক মুদ্রার হার বিনিময়, অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেবে ও পর্যবেণ করে যাবে। আইএমএফের মতে এর ফলে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের বিশেষ করে বিভিন্ন দ্বিপাকি ও বহুপাকি ঋণ বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহায়তা যথাযথ কাজে লাগানোর মতা বাড়বে। আইএমএফের পর্যবেণ পরবর্তী মূল্যায়নকে অন্যান্য দেশ ও সংস্থাসমূহ কাজে লাগাবে। ইতিমধ্যে ৩টি দেশ নাইজেরিয়া, উগান্ডা ও কেপ ভার্দে এই চুক্তিতে স্বার করেছে। যদি বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বার করে তাহলে তারা পৃথিবীর অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে দেখাতে পারবে, বলবে তোমরাও স্বার করো। এজন্য চুক্তিটি দ্রুত স্বার করানোর জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বলা যেতে পারে, পিএসআই চুক্তি মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি কিন্তু আইএমএফের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা স্বল্পোন্নত দেশসমূহের ভালো নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ সংস্থাটি থেকে এখন আর ঋণ সহায়তা নিচ্ছে না। নতুনভাবে কাজ করার অবকাশ যদি আইএমএফ না পায় তাহলে তার টিকে থাকার যৌক্তিকতা আরো প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
২। কাঠামোগত সমন্বয় (Structural Adjustment) থেকে পিআরএসপি এবং এরপর পিএসআই :
মূলত অক্টোবর ২০০৫-এ যুক্তরাষ্ট্র এই পিএসআই ধারণাটি প্রস্তাব করে সেইসব দেশের জন্য যারা আইএমএফ থেকে টাকা নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে অথবা দিতে পারে, তাদের অর্থনীতিতে যাতে একটা নিবিড় পর্যবেণ করা যায় এবং তাদের অর্থনীতি নিয়ে যাতে একটা সিগন্যাল দেয়া যায়। বলা হয়েছে যে, এটা কতটুকু কাজ করলো তা মুল্যায়ন করা হবে ২০০৮ এ। পিআরএসপি প্রক্রিয়ায় আইএমএফ স্বল্পোন্নত দেশসমূহের উপর প্রচুর শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। এর সমালোচনা থেকেই হয়তো আর একটু সহজভাবে শর্ত চাপানোর নামান্তর হিসাবে এই পিএসআই-এর অবতারণা। কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে যে, কাঠামোগত সমন্বয় নীতিমালা থেকে আইএমএফ বা তার যমজ বিশ্বব্যাংক ( আমেরিকার ব্রেটন উড শহরে ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠান দুটির একসাথে জন্ম ) সরে আসেনি। শর্তগুলোর অর্থ এবং বর্তমান রূপ যেরকম_
ক. ব্যবসা বাণিজ্য তথা বাণিজ্য ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ভূমিকাকে ক্রমান্বয়ে খাটো বা নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা।
খ. ব্যক্তি খাত ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রধান্য যাতে বিশেষ করে সামাজিক ও জনসেবা (পানি, শিা, স্বাস্থ্য ও বিদু্যৎ) খাতসমূহে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ কমে যায় বা উঠে যায়।
গ. বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ উন্মুক্ত করা, এজন্য প্রয়োজনে দেশীয় শিল্পকে তুলনামূলকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।
ঘ. রপ্তানীমুখী উৎপাদনকে প্রাধান্য দেয়া। যাতে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে ঋণ পরিশোধে সমতা ধরে রাখতে পারে।
ঙ. আমদানী উদারীকরণের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বাজার খুলে দিয়ে দেশকে ুদ্র উদ্যোক্তার দেশে পরিণত করা বা সেইসব ুদ্র উদ্যোক্তাদের অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেয়া।
চ. নাগরিকদের ভোক্তা কর বাড়ানো, সম্পদ কর ও পুঁজি পাচার কর কমিয়ে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পোক্ত করার মাধ্যমে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর লালন এবং
ছ. কৃষিব্যবস্থায় বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে জনগণের খাদ্য সার্বভৌমত্ব হরণ করা।
আইএমএফের উপরোক্ত নীতির আলোকে বাংলাদেশের পিআরএসপিতে তার (২০০৫-২০০৭) যেসব শর্ত জুড়ে দিয়েছিল তা হচ্ছে_ শূন্য করের মাধ্যমে আমদানীর পূর্ণ উদারীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও কলকারখানা বিক্রি, বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ইত্যাদি। যা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। এমনকি কোন কোন েেত্র আরো বেশী করা হয়েছে, যেমন ২০০৭-০৮ এর বাজেটে শিল্প উৎপাদন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানীর উপর করারোপ। পিএসআই-এর প্রাথমিক পদপে হিসাবে তারা ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির (উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর) সাথে আলোচনা ও পরামর্শ দেয়া শুরু করেছে। আইএমএফের প্রতিনিধি উক্ত করারোপকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল। একইভাবে যেখানে বর্তমানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন সেখানে সরকারকে তারা মুদ্রা সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে বলেছে। যার ফলে গত ২০০৬-০৭ জুনের তুলনায় বিনিয়োগ হার ২০০৭-০৮ জুনে ৩%-এর মতো কমে গেছে। পিআরএসপি থাকুক বা না থাকুক, পরিকল্পনা যাই থাকুক, আইএমএফের পরামর্শ অব্যহত থাকবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে দারিদ্র দূরীকরণের হারের প্রসংশা করেছে, অথচ মুল সত্য হচ্ছে, গত পিআরএসপি পিরিয়ডে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি বছর দারিদ্র হ্রাসের হার মাত্র ১%, হতদরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে ৪০ লাখের বেশি, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় বৈষম্য অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে (এরহর পড়-বভভরপরবহঃ অনুসারে জনসংখ্যার মধ্যে আয় বৈষম্যের বর্তমান অবস্থান হচ্ছে ০.৪৬), মুদ্রাস্ফীতির হার ক্রমবর্ধমান এবং তা বেড়ে ইতিমধ্যেই ২ অংকের ঘর স্পর্শ করেছে যা দারিদ্র ও এমনকি মধ্যবিত্তের জীবনকেও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বেকারত্বের সংখ্যা ৪ কোটির কম নয়। বাজেটে বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্য বরাদ্দ রাজস্ব বাজেটের ২০.৫% যা গত বছরেও ছিল ১৮% এর মতো। মূদ্রস্ফীতির কারণে শিশু ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে ১০-১৫% । স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্ধ বৈদেশিক দেনা পরিশোধের বরাদ্ধের অর্ধেক (যেমন ২০০৭-০৮ এ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্ধ ৭০০ মিলিয়ন ডলার পান্তরে ঋণ পরিশোধ খাতে বরাদ্দ ১৫৬৩ মিলিয়ন ডলার।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক শর্তাবলীর কারণে সত্তর দশক থেকে (১) কৃষির উপর যে সাবসিডি ছিল ৩০%, বর্তমানে তা ১.৫% নেমে এসেছে; (২) পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশান সিস্টেম বা রেশনিং ব্যবস্থা ছিল, তা বর্তমানে শুধুমাত্র আইনশৃংখলা বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে; (৩) আমদানীর েেত্র যেখানে করের পরিমাণ ছিল ৩০০% তা বর্তমানে ৫% কমানো হয়েছে; (৪) ব্যাংক বীমা ও কলকারখানা এমনকি লাভজনক হওয়া সত্বেও বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে এবং (৫) গ্যাস বিদু্যৎ ও পানির দাম বাড়ানো হয়েছে এবং সামনেও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।
৩। আইএমএফের বিশ্বব্যাপী সংকট
আইএমএফের একচোখা নীতি, মূলতঃ শিল্পোন্নত দেশ ও তাদের বহুজাতিক কোম্পানিকেন্দ্রিক ভূমিকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী নিম্নোক্ত সংকটে পড়েছে
ক। প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সংকট (Relevance Crisis)
আইএমএফ যে কাজগুলো করে তা মূলত International Federation of Accountancy (IFAC), International Agency of Standing Committee (IASC) International Organization of Security Commission (IOSC) করে থাকে। তাছাড়া আমরিকানদের চাপে চীনের রপ্তানী কমানোর জন্য বিভিন্ন বাধা নিষেধ আরোপের কারণে সংগঠনটির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রীতি খোলাসা হয়ে পড়েছে। এেেত্র সংগঠনটির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা তা প্রশ্নসাপে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ। মধ্যবর্তী খরচ মেটানোর সংকট
(Medium Term Budget Crisis)
১৯৭৫-এর পর থেকে এই প্রথম আইএমএফের আয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ সালে মাত্র ১৩-১৪টি ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া ছিল। তৃতীয় বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা পাকিস্তান, ৪র্থ বৃহত্তম ঋণ গ্রহীতা ইউক্রেন, সার্বিয়া, অজারবাইজান, তারা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তারা আর ঋণ নেবে না। উপরের ঐ স্বল্পোন্নত দেশগুলো ছাড়াও মধ্যবর্তী আয়ের নিম্নোক্ত দেশসমূহ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে যে, তারা সময়ের আগেই ঋণ শোধ করে দেবে, যেমন থাইল্যান্ড, ফিলিপিন, রাশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেনটিনা, ইন্দোনেশিয়া, তুর্কি ও উরুগুয়ে। এ বাজেট ঘাটতি মোকাবেলার জন্য পরামর্শ দিতে ২০০৭ জানুয়ারিতে একটি কমিটি করা হয়। তারা প্রস্তাব করে যে, ইতিমধ্যে জমা রাখা ৩২০০ টন রিজার্ভ সোনার মধ্যে ৪০০ টন যাতে বিক্রয় করে দেয়া হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় তা আর হয়নি।
গ। মধ্যবর্তী কৌশল বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক রডরিগো ডি রাতো জুন ২০০৪-এ এসে সেপ্টেম্বর ২০০৫-এ আইএমএফের প্রয়োজনীয়তাকে পুনরুদ্ধারের জন্য ৬টি ক্ষেত্র কৌশল ঘোষণা করেন। সেগুলো হচ্ছে (1) Engagement in low income countries, (2) Governance of the fund, (3) Multilateral surveillance of global trade imbalance, (4) Role in emerging market, i.e., crisis prevention (5) Streamlining fund internally & documentation, (6) Capacity building and medium term budget. এসব ক্ষেত্রে রডরিগো ডি রাতো সাহেব ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তিনি তার সময় শেষ হবার ২ বছর আগেই চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বল্পোন্নত দেশসমূহে পিআরএসপি নিয়ে কাজ করার ফলাফল পর্যালোচনা করতে গিয়ে খোদ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক প্রণীত মিলান (ব্রাজিলিয়ান ব্যাংকার) কমিটি আইএমএফের সমালোচনা করে বলেছে যে, আইএমএফ পিআরএসপি করতে গিয়ে অযাচিতভাবে রাষ্ট্রসমূহের বিভিন্ন নীতিতে হস্তপে করেছে। বাণিজ্যিক ভারসাম্যের েেত্র আইএমএফ কোন সমাধানই করতে পারেনি। Aid for trade এখনও Talk show এর মধ্যেই রয়ে গেছে। সত্তর দশকে বিশ্ববাণিজ্যে যেখানে অনুন্নত দেশের অংশগ্রহণের হার ছিল ১% বর্তমানে তা কমে গিয়ে ০.৪%-এ নেমে এসেছে। মধ্যবর্তী আয়ের দেশসমূহে আইএমএফকে সংকট তৈরির হোতা হিসেবে দেখা হয়। মেঙ্েিকা ৯০-৯৫, দণি-পূর্ব এশিয়া ও দণি কোরিয়া ৯৭-৯৮, ইকুয়েডার ৯৮-৯৯ , আর্জেন্টিনা ২০০১ তে অর্থর্ব্যবস্থায় সংকটে (উদাহরণস্বরূপ, মাত্রাতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি, ভয়াবহ রকমের পুঁজিপাচার, জনসেবা খাত ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থসংকট হঠাৎ রপ্তানী বাজার পড়ে যাওয়া) এসবের জন্য তারা আইএমএফের উপদেশ ও শর্তাবলীকেই দায়ী করে। ঐতিহাসিক ঐসব অর্থ সংকটের জন্য আইএমএফের অভ্যন্তরেই অনেক পর্যালোচনা হলেও তারা এখনো সেসব দলিল প্রকাশ করেনি।
ঘ। নিজস্ব গর্ভনেন্স সংকট
কোন লিখিত নিয়ম না থাকা সত্বেও একটা রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে বিশ্বব্যাংকের প্রধান ব্যক্তি হবে আমেরিকা থেকে এবং আইএমএফের প্রধান হবেন ইউরোপ থেকে। সেই হিসেবে ইউরোপীয়রা ইতিমধ্যে রডরিগো ডি রাতোর স্থলাভিসিক্ত করার জন্য ফ্রান্সের ডমেনিক স্ত্রাউস খানের নাম ঘোষণা করেছে। রাশিয়া ইতিমধ্যে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। উঠতি বাজার অর্থনীতির দেশ যেমন, ব্রাজিল, ভারত ও চীন ইতিমধ্যে এর বিরোধিতা করেছে। ২০০৫-এ সিংগাপুরের বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুমোদন করা হয়েছিল যে, প্রথম পর্যায়ে ২০০৬-এর মধ্যে চীন, দণি কোরিয়া, মেঙ্েিকা ও তুর্কীর শেয়ার ভোট বাড়ানো হবে এবং ২০০৮-এর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের ভোট বাড়ানো হবে। পরীা করে দেখা গেছে, এর ফলে ঐসব দেশসমূহের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার মতা ১% এর উপরে যাবে না। মূল বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটিকে গণতান্ত্রিক হতে হলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মতো "এক দেশ এক ভোট" ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিতে এখনও শিল্পোন্নত দেশসমূহের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বেশী বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মতা তাদেরই বেশী।
৪। বিশ্বব্যাপী আইএমএফ স্বৈরাচারদের দোসর
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইএমএফ স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে, অথবা তাদের সাথে কাজ করেছে, সেই দেশে ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে অথবা অর্থ সংকট তৈরি করেছে। যেমন, চিলিতে পিনোশেটের সাথে, ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তো, ফিলিপিনে মার্কোস, জায়ারে মুবুতু, আর্জেন্টিনায় ভিরেলার সাথে। বর্তমান সময়ে তারা কংগো ব্রাজিভিলে সুসুুএনগুমো এবং চাদে ডেভির সরকারকে সহায়তা করেছে।
আমরা কোনভাবেই মনে করি না যে, আমাদের বর্তমান সরকার অ-শাসনতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক। কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে, আইএমএফ পার্লামেণ্ট না থাকার কারণে সরকারকে ভুল পথে পরিচালনা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারে। ফিলিপিনে মার্কোসের হাত ধরে, ইন্দোনেশিয়ায় সুহাতের্ার সহায়তায় দেশ দুটিকে তারা আকণ্ঠ ঋণের ভারে জর্জরিত করে রেখেছে। দেশ দুটির বাজেটের ৫০% এর উপরে বৈদেশিক ঋণের জন্য ব্যয় করতে হয়। এশিয়ান অর্থসংকটের (৯৭-৯৮) দেশসমূহ এখনো ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পাশর্্ববর্তী দেশ ভারত যখন মূদ্রাস্ফীতির হার ৫% থেকে ৩% এ নামিয়ে নিয়ে আনতে পেরেছে, যেখানে আমাদের মূদ্রস্ফীতির হার বাস্তবিক প েদশের উপরের দিকে চলে গেছে। সরকারের সামপ্রতিক কিছু বিরাষ্ট্রীয়করণ ও অন্যান্য কর্মকান্ডের কারণে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েছে। ইতিমধ্যে বন্যার কারণে সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। যদিও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। আমাদের শংকা যে কোন ভুল সিদ্ধান্ত প্রকট অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
৫। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের বিকল্প
ইতিমধ্যে আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এডিবি) কাজকর্মের গুঢ় উদ্যেশ্য ২ নং সেকশনে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এদের বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কৌশলপত্র অনুসারে আগামী কয়েক বছরে তারা যে কাজগুলো করতে পারে,
ক। বিশেষ করে পানি ও বিদু্যৎ খাতে দাম বৃদ্ধি, তথা এটাকে ব্যক্তিখাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়া।
খ। যেহেতু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রির্জাভের পরিমাণ বেশী সেহেতু এখানে আরো বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত, তাদের মুনাফা পাচারের পথ সহজ করা এবং দেশটিতে আরো ঋণ প্রদান করা। ফিলিপিন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো ঋণ প্রদানের এই ত্রে সরাসরি স্থানীয় সরকার পর্যন্ত হতে পারে।
গ। জনসেবা খাত বিশেষ করে শিশু ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে VATবাড়ানো, যাতে সরকার এই খাতে বরাদ্দ কমাতে পারে ।
ঘ। সরকারী রাজস্ব বৃদ্ধির নামে সাধারণ ভোক্তার উপর ঠঅঞ বাড়ানো, অন্যদিকে বিভিন্নভাবে ধনীদেরও সম্পদের ট্যক্স্ কমানো,যার ফলে ধনী গরিবের বৈষম্য বাড়বে।
মূলত এই বিষয়গুলো গরিব ও মধ্যবিত্তের জন্য সমস্যা তৈরি করবে বৈকি। ইতিমধ্যে ধনী দেশগুলোতেও এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে কথা উঠেছে। টনি ব্লেয়ারের আফ্রিকা কমিশনে (২০০৫) আইএমএফ পলিসিগুলোকে Analytically Unsound বলে অভিহিত করেছে । UNDP তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এদের শর্তসমূহের সমালোচনা করেছে। নরওয়ে সরকার এদের শর্তসমূহের সমালোচনা করেছে, তারা বাংলাদেশ থেকে উদাহরণ নিয়ে গবেষণা করেছে।
ইতিমধ্যে বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে ও ভেনেজুয়েলা বিকল্প হিসেবে Bank of South করার ঘোষণা দিয়েছে। কিউবা, হাইতি, নিকারাগুুয়া ও ভেনেজুয়েলা ALBA ব্যাংক করার ঘোষণা দিয়েছে। উপরোক্ত বহুজাতিক ব্যবস্থার বিপরীতে বিকল্প আঞ্চলিক ও দ্বিপাকি ব্যাংক ও সহায়তা তহবিল গড়ে তোলার চেষ্টা জোরদার হচ্ছে। বাংলাদেশের এ ক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে, যেমন -
ক। বাংলাদেশ প্রতিবছর ১.৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা পায়, অথচ আমাদের বৈদেশিক রেমিটেন্সের পরিমাণ প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। আমরা এই বৈদেশিক মুদ্রা শুধুমাত্র আমদানী খরচ ও বৈদেশিক কোম্পানিগুলোর মুনাফা দেয়ার জন্য ব্যয় না করে এগুলো দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনমূলক খাতে ব্যয় করতে পারি।
খ। বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামে বিশেষ করে SAARC এ বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার ত্রেগুলো বিশেষ করে দণি এশিয় ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব করতে পারে। আঞ্চলিক ও দ্বিপাকি বাণিজ্য ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে পারে।
গ। রাষ্ট্রীয় খাতে প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে কৃচ্ছ্রতা সাধন করে রাষ্ট্রের অনুন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ কমাতে পারে। কর ব্যবস্থা এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে এটি সাধারণ ভোক্তা বিশেষ করে গরিব মানুষের উপর চাপ কমিয়ে দেয় এবং পুঁজি পাচারের পথ প্রশস্থ না করে।
আমরা আশা করব, সরকার আইএমএফ সহ আর্ন্তজাতিক অর্থলগি্নকারী প্রতিষ্ঠানসমুহের কাজকর্মের উপর পর্যালোচনা করবেন এবং বিকল্প মতামতসমূহের পথ প্রশস্থ করে দেবেন।